বন্ধুত্ব শিশুর মানসিক সুস্থতার বড় ভিত, আর বন্ধু বানানো ও ধরে রাখা শেখা যায় এমন একটি দক্ষতা। বাবা-মা সন্তানের হয়ে বন্ধু বানিয়ে দিতে পারবেন না, কিন্তু সুযোগ তৈরি করা, দক্ষতা শেখানো আর পাশে থাকা সম্ভব। বন্ধুর সংখ্যা নয়, একজন-দুজন ভালো বন্ধুই যথেষ্ট। কিশোর বয়সে বন্ধুদের প্রভাব বাড়ে; তখন নিষেধের চেয়ে খোলামেলা সম্পর্ক বেশি কাজে দেয়।

বয়স অনুযায়ী বন্ধুত্ব

বয়স বন্ধুত্বের ধরন বাবা-মায়ের ভূমিকা
৬–৮ বছর একসাথে খেলা, বারবার বন্ধু বদল খেলার সুযোগ তৈরি, পালা ও শেয়ার শেখানো
৯–১২ বছর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, দল, "বেস্ট ফ্রেন্ড" ঝগড়া মেটানোর কৌশল, বাদ পড়ার কষ্টে পাশে থাকা
১৩–১৭ বছর গভীর আস্থা, বন্ধুদের চাপ, সম্পর্ক শোনা, নিরাপত্তার সীমা, বন্ধুদের চেনা

৬–৮ বছর: সুযোগ তৈরি করুন

ক্লাসের এক-দুজন সহপাঠীকে বাসায় খেলতে ডাকুন। খেলার আগে শিশুর সাথে আলোচনা করুন: অতিথিকে কী খেলতে বলবে, কীভাবে খেলনা ভাগ করবে। এই বয়সে বন্ধু ঘন ঘন বদলায়, এটা স্বাভাবিক।

৯–১২ বছর: ঝগড়া মেটানো ও বাদ পড়া

এই বয়সে "আজ থেকে তোর সাথে কথা নেই" খুব শোনা যায়। সন্তান দুঃখ পেলে আগে শুনুন। তারপর ভাবতে সাহায্য করুন: "তুমি কী চাও? বন্ধুত্ব ঠিক করতে? তাহলে কী বলতে পারো?" কোনো দল থেকে বারবার বাদ পড়লে বা উপহাস হলে, সেটা বুলিং কিনা খেয়াল রাখুন।

১৩–১৭ বছর: আস্থা ও বন্ধুদের চাপ

কিশোরেরা বন্ধুদের কাছ থেকে মতামত ও স্বীকৃতি চায়। ধূমপান, নেশা, ঝুঁকিপূর্ণ বাইক চালানো বা অনলাইনে ঝুঁকির মতো চাপ আসতে পারে। আগে থেকে আলোচনা করুন কীভাবে "না" বলবে, আর বিপদে পড়লে যেন আপনাকে ফোন করতে পারে বকা খাওয়ার ভয় ছাড়াই। তার বন্ধুদের নাম, পরিবার চিনুন; বাসায় আসতে উৎসাহ দিন।

বন্ধু বানানোর দক্ষতা শেখানো

  • শুরু করা: "আমি কি তোমাদের সাথে খেলতে পারি?" বলা, রোল-প্লে করে চর্চা।
  • আগ্রহ দেখানো: বন্ধুকে প্রশ্ন করা, তার কথা শোনা।
  • শেয়ার ও পালা: খেলনা, সময়, কথা বলার সুযোগ।
  • ক্ষমা চাওয়া ও মেনে নেওয়া।
  • "না" বলা: যা ঠিক মনে হয় না, তাতে দৃঢ়ভাবে না বলা।

খারাপ সঙ্গ নিয়ে দুশ্চিন্তা

"ওর সাথে মিশবে না" বললে কিশোরেরা প্রায়ই লুকিয়ে মেশে। বরং:

  • বন্ধুকে বাসায় ডেকে চিনুন।
  • ব্যক্তি নয়, আচরণ নিয়ে কথা বলুন: "রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা আমাদের পরিবারে চলবে না।"
  • নিরাপত্তার নিয়ম স্পষ্ট রাখুন: কোথায়, কার সাথে, কখন ফিরবে।
  • নেশা, অপরাধ বা যৌন ঝুঁকির স্পষ্ট লক্ষণে দৃঢ় পদক্ষেপ নিন এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিন।

যা এড়িয়ে চলবেন

  • সন্তানের বন্ধুদের সামনে তাকে লজ্জা দেওয়া।
  • "তোর বন্ধুরা সব বাজে" জাতীয় সাধারণ মন্তব্য।
  • সামাজিক জীবনকে পড়াশোনার শত্রু ভাবা; বন্ধুত্বও বিকাশের অংশ।
  • বন্ধু বাছাই করে দেওয়া পরিবারের মর্যাদা দেখে।

বাংলাদেশের পরিবারে বাস্তবতা

ঢাকার মতো শহরে স্কুল আর কোচিংয়ের বাইরে শিশুদের দেখা হওয়ার সুযোগ কম, আর অনেক বাবা-মা নিরাপত্তার কারণে বাইরে যেতে দেন না। প্রতিবেশী পরিবারের সাথে মিলে খেলার আয়োজন, স্কুলের ক্লাব, খেলাধুলার দল বা স্কাউটিং বন্ধুত্বের ভালো সুযোগ। কাজিনরাও প্রথম বন্ধু হতে পারে।

কখন সাহায্য নেবেন

যদি সন্তানের দীর্ঘ সময় কোনো বন্ধু না থাকে এবং সে একা ও দুঃখী বোধ করে, সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড উদ্বেগ হয়, কিশোর বয়সে হঠাৎ পুরোনো বন্ধু ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ দলে যায়, বা নেশার লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে স্কুল কাউন্সেলর বা শিশু-কিশোর মনোবিদের পরামর্শ নিন।

সম্পর্কিত গাইড