মায়ের নিজের যত্ন বিলাসিতা নয়, মা ও শিশু দুজনের সুস্থতার ভিত্তি। গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ ও পুষ্টি, আর প্রসবের পর বিশ্রাম, খাবার ও মনের যত্ন: প্রতিটি ধাপে কয়েকটি মূল কাজ মনে রাখলেই অনেক জটিলতা এড়ানো যায়। আর বিপদের লক্ষণ চেনা থাকলে দেরি না করে সাহায্য নেওয়া যায়।
এক নজরে: প্রতিটি ধাপে মূল কাজ
| ধাপ | মূল কাজ |
|---|---|
| গর্ভধারণের আগে | স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক অ্যাসিড, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ |
| প্রথম ত্রৈমাসিক | প্রথম চেকআপ ১২ সপ্তাহের মধ্যে, বমিভাব সামলানো, বিশ্রাম |
| দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিক | নিয়মিত চেকআপ, পুষ্টি, হালকা নড়াচড়া, প্রসবের প্রস্তুতি |
| প্রসবের পর প্রথম তিন মাস | প্রসব-পরবর্তী চেকআপ, বিশ্রাম, পুষ্টি, মনের যত্ন |
গর্ভধারণের আগে
- চিকিৎসকের সাথে প্রি-কনসেপশন আলোচনা: রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, রক্তস্বল্পতা পরীক্ষা।
- চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক অ্যাসিড শুরু।
- নিয়মিত ওষুধ খেলে, গর্ভাবস্থায় নিরাপদ কি না জেনে নিন।
- ধূমপান ও তামাক (জর্দা, গুল) পুরোপুরি বন্ধ।
গর্ভাবস্থায়
- চেকআপ: WHO কমপক্ষে আটবার স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়, প্রথমটি ১২ সপ্তাহের মধ্যে।
- খাবার: ভাত-রুটির সাথে ডাল, মাছ-মাংস-ডিম, শাকসবজি, ফল, দুধ; চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন ও ক্যালসিয়াম।
- নড়াচড়া: চিকিৎসক নিষেধ না করলে প্রতিদিন হালকা হাঁটা।
- ত্বকের যত্ন: পেট ও উরুর ত্বক টানে, চুলকায়; প্রতিদিন ময়েশ্চারাইজার লাগালে আরাম হয়, যদিও কোনো ক্রিম স্ট্রেচ মার্ক পুরোপুরি ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেয় না।
- মন: দুশ্চিন্তা ও আবেগের ওঠানামা স্বাভাবিক; কারও সাথে ভাগ করুন।
প্রসবের পর প্রথম তিন মাস
- চেকআপ: WHO-এর প্রসব-পরবর্তী নির্দেশনা প্রথম ছয় সপ্তাহে অন্তত চারবার মা ও শিশুর চেকআপের কথা বলে।
- বিশ্রাম: শিশু ঘুমালে আপনিও বিশ্রাম নিন; ঘরের কাজ অন্যদের দিন।
- খাবার ও পানি: বুকের দুধ খাওয়ালে বাড়তি পুষ্টি ও পানি দরকার।
- সেলাই ও শরীর: সেলাইয়ের জায়গা পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। সাপোর্টের জন্য বেলি র্যাপ অনেকের আরাম দেয়; সিজারের পর কবে থেকে পরবেন, চিকিৎসকের কাছে জেনে নিন।
- পরিবার পরিকল্পনা: পরের সন্তানের ব্যবধান নিয়ে প্রসব-পরবর্তী চেকআপে আলোচনা করুন।
- মন: প্রথম দুই সপ্তাহ "বেবি ব্লুজ" (কান্না, মন খারাপ) সাধারণ। এর বেশি থাকলে সাহায্য নিন।
বিপদের লক্ষণ: দেরি করবেন না
WHO জানায়, মাতৃমৃত্যুর বেশিরভাগ কারণ প্রতিরোধযোগ্য। নিচের যেকোনো লক্ষণে সাথে সাথে হাসপাতালে যান:
গর্ভাবস্থায়: রক্তপাত, তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা, হাত-মুখ হঠাৎ ফুলে যাওয়া, খিঁচুনি, পানি ভাঙা, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর।
প্রসবের পর: অতিরিক্ত রক্তপাত, জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, সেলাইয়ের জায়গা লাল-ফোলা-পুঁজ, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, পায়ে একপাশে ফোলা ও ব্যথা, স্তনে তীব্র ব্যথা-লালচে ভাব ও জ্বর, নিজের বা শিশুর ক্ষতির চিন্তা।
বাংলাদেশের পরিবারে বাস্তবতা
প্রসবের পর "চল্লিশ দিন" বিশ্রামের প্রচলিত রীতি মায়ের বিশ্রামের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে কিছু খাবার নিষেধের প্রথা (মাছ, ডিম, শাক না খাওয়া) মায়ের পুষ্টির ক্ষতি করে। খাবারের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকেও গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা পাওয়া যায়।
কখন সাহায্য নেবেন
ওপরের বিপদের লক্ষণে সাথে সাথে হাসপাতালে যান (জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯)। প্রসবের পর দুই সপ্তাহের বেশি মন খারাপ, উদ্বেগ, আনন্দ না পাওয়া বা ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসককে জানান; প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার চিকিৎসা আছে।
